ইকবাল হোসেন
এই পৃথিবীতে এমন অনেক দৃশ্য আছে যা আমাদের চোখে ধরা পড়ে কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে যায়। হয়তো সেটা পাহাড়ে ওঠা ভোরের আলো, হয়তো সমুদ্রের গর্জন, হয়তো কোনো চেনা শহরের নির্জন রাস্তা। তবুও, এতসব সৌন্দর্যের ভিড়ে একটি দৃশ্য আছে, যা নিঃশব্দে আমাদের ভেতরের আলো জ্বেলে তোলে-মানুষের খাঁটি আনন্দ দেখা। শুধু দেখার জন্য নয়, এই দৃশ্য অনুভবের জন্য। এটা সেই মুহূর্ত, যখন কারও মুখে একটি সত্যিকারের হাসি ফোটে, যখন চোখজোড়া জ্বলজ্বলে আনন্দে ভরে ওঠে, যখন চেহারায় প্রশান্তির রেখা খেলে যায়-সেই সময় আমরা মানবিকতার সবচেয়ে নিখুঁত চিত্রটি দেখি।
একটি শিশুর প্রথম হাঁসি
একটি সদ্যোজাত শিশু যখন প্রথমবার তার মা-বাবার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে, সেই মুহূর্তটি যেন পুরো পৃথিবী থেমে যায়। ক্লান্ত দুই চোখ, জেগে থাকা রাত, শারীরিক কষ্ট-সবকিছু নিমিষেই যেন হারিয়ে যায় এই একটি খাঁটি হাঁসিতে। এখানে নেই কোনো ভান, নেই কোনো সাজানো অভিনয়-শুধু নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর নিখাঁদ আনন্দ।
বহুদিন পর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়া
ট্রেন স্টেশনে বহুদিন পর দুইজন প্রিয় মানুষের পুনর্মিলনের দৃশ্য দেখেছেন কখনো? চোখে জল, মুখে হাসি, বুকভরা আবেগ-এই দৃশ্য দেখার সময় আশপাশের কোলাহল থেমে যায়। তখন মনে হয়, “এটাই তো জীবনের আসল সার্থকতা।”
একজন খেটে খাওয়া মানুষের মুখে হাসি
দিনভর রোদে পুড়ে, গায়ে ঘাম মেখে একজন রিকশাচালক যখন তার দিনের শেষ যাত্রা শেষে তৃপ্তির হাসি হাসে, সেটা কেবল আয় নয়-এটা জীবনের সাথে তার শান্তিপূর্ণ বোঝাপড়ার বহিঃপ্রকাশ। এই খাঁটি আনন্দের মুহূর্তেই জীবনের গভীরতা ধরা পড়ে।
পিতা-মাতার চোখে সন্তানের সাফল্যের আনন্দ
একজন মা যখন বলেন, “আমার মেয়ে ডাক্তার হয়েছে,” কিংবা একজন বাবা যখন গর্ব করে বলেন, “আমার ছেলেটা চাকরি পেয়েছে”-তাদের চোখে যে আনন্দ, সেটাই তো সবচেয়ে অমূল্য দৃশ্য। এই আনন্দে থাকে বছরের পর বছর ধরে জমানো স্বপ্ন, ত্যাগ, অশ্রু আর অন্তহীন অপেক্ষা।
মানুষের আনন্দই সবচেয়ে খাঁটি রূপ
মানুষের আনন্দকে কেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বলা যায়? কারণ, এই দৃশ্য কেবল বাইরের নয়, এটি ভেতর থেকে আলো ছড়ায়। এই মুহূর্তগুলোতে মানুষ ভুলে যায় দুঃখ, দ্বন্দ্ব, ভেদাভেদ। এই আনন্দ মানুষকে মানুষ করে তোলে-তাকে করে তোলে সজীব, সংবেদনশীল, সাহসী।
আমরা যতই প্রযুক্তির দিকে এগোই, মাটির টান আর হৃদয়ের টান হারাতে বসেছি। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন হাজারো ছবি দেখি, কিন্তু কয়টাতে থাকে খাঁটি অনুভব? কয়টাতে থাকে নিঃস্বার্থ আনন্দ?
এই ব্যস্ত আর যান্ত্রিক জীবনে কখনো যদি নিজেকে নিঃস্ব মনে হয়, একবার চারপাশে তাকান। খুঁজে দেখুন সেই মানুষটিকে, যে হয়তো সামান্য কিছুতেই খুব খুশি হয়েছে। দেখুন সেই মায়ের মুখ, যার সন্তানের জন্য গর্বে চোখ ভিজে গেছে। খেয়াল করুন সেই বন্ধুর চোখ, যে হয়তো আপনাকে দেখে আনন্দে চুপচাপ হেসে উঠেছে।
এইসব দৃশ্য আমাদের শেখায়-জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু অনুভবের দিক থেকে অসাধারণ। তাই বলি,পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস?
মানুষের আনন্দ দেখা। এই আনন্দ কাঁদায়, হাসায়, আর আমাদের আবার মানুষ করে তোলে।
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
শ্রীপুর, গাজীপুর
Leave a Reply